গর্ভাবস্থায় রেসাস বা Rh ফ্যাক্টর স্বামী-স্ত্রী রক্তের গ্রুপ (+ -) কি প্রভাব ফেলতে পারে?

গর্ভাবস্থায় রেসাস বা Rh ফ্যাক্টর এর প্রভাব জানার আগে রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে কিছু জেনে নেয়া যাক। মানুষের রক্তের ধরন সাধারনত দুটো পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়। এর একটি হোল ABO পদ্ধতি যাতে রক্তকে চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। এগুলো হোল- A, B, AB এবং O। লোহিত রক্তকণিকায় দু ধরনের স্বতন্ত্র অ্যান্টিজেন থাকে (এক ধরনের প্রোটিন)। একটি অ্যান্টিজেনকে “A” এবং আরেকটি অ্যান্টিজেনকে “B” নামকরন করা হয়েছে। যদি রক্তের লোহিত কণিকায় A অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি থাকে তবে তাক Type-A রক্ত বলা হয়। যদি B অ্যান্টিজেন থাকে তবে Type- B, যদি দুধরনের অ্যান্টিজেনই থাকে তবে Type-AB এবং কোনটি উপস্থিত না থাকলে সে রক্তকে বলা হয় Type-O।

রক্তের গ্রুপিং করার আরেকটি পদ্ধতি হলে রেসাস (Rh) পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে রক্তের Rh ফ্যাক্টর নির্ণয় করা হয় যা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত একধরনের অ্যান্টিজেন বা প্রোটিন যা রক্তের লোহিত কনিকার উপরিভাগে থাকে। যাদের রক্তে Rh ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকে তাদের Rh positive আর যাদের রক্তে থাকেনা তাদের Rh Negetive  বলে।

রেসাস প্রজাতির বানরের মধ্যে প্রথম এ ফ্যাক্টরটি পাওয়া গিয়েছিল বলে এর নামকরণ করা হয়েছে Rhesus বা সংক্ষেপে Rh ।

পৃথিবীতে Rh Positive মানুষের সংখ্যা Rh Negetive মানুষের চাইতে বেশী। পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ ভাগ মানুষই Rh Positive। ABO এবং  Rhesus এই দুটো পদ্ধতি মিলিয়েই রক্তের গ্রুপিং করা হয়। যেমন কারো রক্তের গ্রুপ যদি AB+ হয় তার মানে তার শরীরে AB টাইপের রক্ত আছে এবং সে Rh Positive। আবার কারও রক্তের গ্রুপ যদি হয় O- তার মানে হলে তার রক্তের টাইপ O এবং সে Rh Negetive।

 

গর্ভাবস্থায় রেসাস বা Rh ফ্যাক্টর  গুরুত্বপূর্ণ কেন?

গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মায়ের Rh ফ্যাক্টর জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সাধারণত প্রথম প্রি-ন্যাটাল ভিসিটেই মায়ের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। Rh ফ্যাক্টর শুধুমাত্র তখনই উদ্বেগের বিষয় যখন মায়ের তা নেগেটিভ থাকে এবং গর্ভের শিশুর পজিটিভ থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি বাচ্চার রক্ত মায়ের রক্তের সংস্পর্শে আসে তাহলে মায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থা সেটিকে বাহ্যিক ক্ষতিকারক পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করবে এবং তা প্রতিরোধ করার জন্য অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করবে। একে sensitising বলে। যার ফলে বাচ্চার অনেক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

যদি মায়ের Rh পজিটিভ হয় সেক্ষেত্রে ভয়ের কিছু নেই এমনকি বাচ্চা যদি Rh নেগেটিভও হয়। কারণ গর্ভের শিশু এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করেনা।

যদি মায়ের এবং বাচ্চার বাবার দুজনই Rh নেগেটিভ হয় সেক্ষেত্রেও ভয়ের কোন কারণ নেয় কারণ তাদের বাচ্চাও Rh নেগেটিভ হবে এবং মায়ের শরীর তাকে কোন বাহ্যিক পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করবেনা।

যদি মায়ের Rh নেগেটিভ হয় এবং বাচ্চার বাবা Rh পজিটিভ হয় তবে বাচ্চার Rh পজিটিভ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী কারণ পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষই Rh পজিটিভ।

Rh  নেগেটিভ হলে কি কি জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে?

Rh  নেগেটিভ মায়ের রক্ত Rh পজিটিভ শিশুর রক্তের অ্যান্টিজেনের এর সংস্পর্শে আসলে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং শিশুর রক্তের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে যাকে  sensitising বলে। sensitizing সাধারণত প্রথমবার গর্ভধারণে তেমন কোন ক্ষতি করতে পারেনা কারণ সাধারণত বাচ্চার প্রসবের আগ পর্যন্ত বাচ্চার রক্ত মায়ের রক্তের সংস্পর্শে আসেনা। ফলে মায়ের শরীর অ্যান্টিবডি  তৈরি করার আগেই বাচ্চার জন্ম হয়ে যায়।

পরবর্তীতে আবার গর্ভধারণ করলে এবং সেবারও যদি বাচ্চা Rh পজিটিভ হয় তবে জটিলতার সৃষ্টি হবে। যেহেতু প্রথমবার বাচ্চা জন্মের সময় থেকেই মায়ের শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল এবার তা দ্রুত বাড়তে থাকবে এবং প্লাসেন্টা অতিক্রম করে বাচ্চার রক্তের কোষগুলোকে আক্রমন করবে।

তবে স্বস্তির বিষয় হোল anti-D immunoglobulin (anti-D) ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মায়ের শরীরে তৈরি অ্যান্টিবডির ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া কমানো যায় তাই জটিলতা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু যদি প্রথমবার গর্ভধারণের সময় এর চিকিৎসা করা না হয় তবে পরবর্তী গর্ভধারণের মায়ের অ্যান্টিবডি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং বাচ্চার Rhesus ডিজিজের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে মায়ের অ্যান্টিবডি গর্ভাবস্থাতেই বাচ্চার রক্তের কোষগুলোকে আক্রমন করে এবং বাচ্চার জন্মের পরেও কয়েক মাস পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

Rhesus ডিজিজের ফলে বাচ্চার দেহে এনেমিয়া সৃষ্টি হয়। এনেমিয়া যদি মারাত্মক আকার ধারন করে তবে তার ফলে বাচ্চার অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে- যেমন হার্ট ফেইলিউর এবং ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।

এর কারণে বাচ্চার জন্মের পর বাচ্চার যকৃত ঠিক মত কাজ করতে পারেনা  ফলে বাচ্চা জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। এর ফলে বাচ্চার স্থায়ী ব্রেইন ড্যামেজ, স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে যেমন- সেরিব্রাল পালসি। এছাড়াও বাচ্চা জন্মের পর মারা যাওয়ার ও সম্ভাবনা থাকে।

এভাবে এর পরের প্রত্যেকবার গর্ভধারণে মায়ের শরীর আরও বেশী Rh পজিটিভ রক্তের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। যখন তা মারাত্মক পর্যায়ে চলে যায় তখন বাচ্চা গর্ভেই মারা যেতে পারে।

 

এ সমস্যা থেকে মুক্তি উপায় কি?

Rh ফ্যাক্টরের কারণ হওয়া সমস্যাগুলো অনেক ভয়ংকর কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা ব্যাবস্থা অনেক উন্নত এবং এমন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে যার ফলে এ সমস্যা গুলো অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।

মায়ের যদি Rh নেগেটিভ পাওয়া যায় তবে সাধারণত ২৮ সপ্তাহে ডাক্তাররা একটি Anti-D ইঞ্জেকশন দেন। যদিও প্রথম গর্ভধারণে শিশুর প্রসবের আগ পর্যন্ত শিশুর রক্ত মায়ের রক্তের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা কম থাকে তারপরও কোন কারণে যদি এমনটা আগেই এমন টা হয়ে যায় তাই এ সময় একবার ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। এছাড়াও ৩৪ সপ্তাহে একবার দেয়া হতে পারে এবং বাচ্চার জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এটি আবার দেয়া হয়। এর ফলে বাচ্চার শরীর থেকে মায়ের শরীরে প্রবাহিত Rh  পজিটিভ রক্ত ধ্বংস হয়ে যায় এবং মায়ের শরীর আর অ্যান্টিবডি তৈরি করেনা।

গর্ভকালীন সময়ে যদি যোনী পথে রক্তক্ষরণ হয়, বা এমন কোন পরীক্ষা করার দরকার পরে যার ফলে বাচ্চার রক্ত মায়ের রক্তের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে ও এই ইঞ্জেকশন দেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।

যদি প্রথমবার গর্ভধারণে Rh নেগেটিভ মায়েদের গর্ভপাত, এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি, বা গর্ভ নষ্ট হয়ে যায় সে ক্ষেত্রেও পরবর্তী গর্ভধারণ নিরাপদ করার জন্য এই ইঞ্জেকশন দেয়া হয়।

 

যদি মায়ের রক্তে ইতিমধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায় তাহলে কি হতে পারে?

যদি মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে Anti-D ইঞ্জেকশন কাজ করবেনা। এটি অ্যান্টিবডি তৈরি হতে বাঁধা দেয় কিন্তু তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি ধ্বংস করতে পারেনা। এক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময়ে বাচ্চাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হবে যাতে এনেমিয়ার লক্ষন টের পাওয়া যায়। এনেমিয়া যদি মারাত্মক আকার ধারন করে তবে শিশু গর্ভে থাকা অবস্থাতেই রক্ত পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে আগেই বাচ্চা প্রসব করানো হয় যাতে বাচ্চার চিকিৎসা তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়।

জন্মের পর বাচ্চাকে নিউন্যাটাল কেয়ারে রাখা হয়। জন্ডিসের জন্য ফটোথেরাপি দেয়া হতে পারে এবং রক্ত পালটানো হতে পারে। যদি অবস্থা গুরুতর হয়ে যায় তবে বাচ্চাকে এন্টিবডির ইঞ্জেকশন দেয়া হতে পারে যাতে তার রক্তের কণিকা গুলো ধ্বংস হয়ে না যায়।

সবশেষে মনে রাখা উচিত যে কোন ওষুধের মতই Anti-D ইঞ্জেকশন ১০০ ভাগ কার্যকর নয়। তাই এই ইঞ্জেকশন নেয়া সত্ত্বেও প্রত্যেকটি গর্ভাবস্থায় রেসাস বা Rh ফ্যাক্টর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য পরবর্তী প্রত্যেকটি গর্ভধারণে আপনার ডাক্তারকে Rh ফ্যাক্টরের ব্যাপারে অবহিত করুন। এর ফলে আপনার এবং আপানার শিশুর জন্য সবচাইতে ভালো সিদ্ধান্ত নেয়াটা আপনার ডাক্তারের পক্ষে সহজ হবে।

সুত্রঃ fairyland

Sharing is caring!

Comments are closed.