Home সোনামনির যত্ন বাচ্চার পটি ট্রেনিং বা টয়লেট ট্রেনিং এর কিছু টিপস

বাচ্চার পটি ট্রেনিং বা টয়লেট ট্রেনিং এর কিছু টিপস

16 second read
0
966

শিশুকে মলমুত্র ত্যাগের প্রশিক্ষণ দেয়া শিশু পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শরীর থেকে বর্জ্যদ্রব্য বের করে দেয়া একটি প্রাকৃতিক নিয়ম।প্রত্যেক সচেতন মায়ের গুরু দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক সময়ে এই প্রশিক্ষণ দেয়া। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী ১৮ মাসের মধ্যে শিশুদের এই প্রশিক্ষণ দেয়া হলে তারা দ্রুত শিখে ফেলে এবং ২২-৩০ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে শিখে ফেলে। তবে এই ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়ে শিশুরা দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে।  শিশুদের মধ্যে দেখা যায় দিনের বেলা মল মুত্র নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা আগে আসে এবং পড়ে রাতে নিয়ন্ত্রন করার দক্ষতা অর্জন করে। শিশুদের টয়লেট ট্রেনিংয়ে অভ্যস্থ করানোর বিষয়েই আজকের আলোচনা।

আগে দেখে নিন বাচ্চা পটি ট্রেনিং বা টয়লেট ট্রেনিং এর জন্য প্রস্তুত কিনা?

পটি ট্রেনিং দেওয়ার আগে খেয়াল রাখতে হবে যে শিশু শারীরিকভাবে তৈরি কি না। এ কাজে সফল হতে হলে শিশুর পেশিগুলো মজবুত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করে নিতে হবে। শিশু বসতে শেখার আগে পটি ট্রেনিং শুরু না করাই ভালো।মূলত, এই দেখে নেওয়ার মানে হচ্ছে শিশু আসলেই এই মূহুর্তে পটি ট্রেনিং-এর জন্য প্রস্তুত কিনা খেয়াল করা। চেকলিস্টটি এরকম-

শারীরিক সংকেত-

  • কনফিডেন্টলি হাটতে এবং দৌঁড়াতে পারে কিনা।
  • প্রস্রাব করবার সময় পর্যাপ্ত পরিমানে করছে কিনা, নাকি অল্প অল্প করে কিছুক্ষণ পর পর করছে।
  • নির্দিষ্ট সময় পর পর বা তার আশেপাশের সময়ে মলত্যাগ করছে কিনা।
  • জামা কাপড় পরা বা খোলার সময় আপনাকে সহযোগিতা করছে কিনা।
  • দিন বা রাতে ঘুমালে অন্তত দু’ঘন্টা শুকনো অবস্থায় থাকছে কিনা। এটা মূলত যাচাই করা যে ওর ব্লাডার এর পেশীগুলো পূর্ণভাবে শক্তিশালী হয়েছে কিনা।

আচরণগত সংকেত-

  • বেশ কিছু সময় (৫ মিনিট নিদেনপক্ষে) কোন কিছু নিয়ে নিবিষ্ঠ মনে বসে থাকতে পারা।
  • নিজে নিজে প্যান্ট খুলতে বা পড়তে পারা।
  • ভেজা অবস্থায় থাকলে অস্বস্তিতে ভোগা।
  • পায়খানার বেগ পেলে তা বলে বা ইংগিত দিয়ে প্রকাশ করতে পারা।
  • স্বাবলম্বী আচরণ প্রকাশ করা।
  • কোন কিছু করতে পারার (সাফল্য) পর; তার জন্য গর্ববোধ করা।
  • সহযোগীতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করা।

জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ সংকেত-

  • প্রস্রাব বা পায়খানার বেগ পেলে তার শারীরিক তাড়না বুঝতে পারা। এক্ষেত্রে পটিতে গিয়ে বসতে হবে বা মা-বাবা/ যার কাছে থাকছে তাকে বলবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করা (সাহায্য নেবার জন্য)।
  • সাধারণ নির্দেশগুলো পালন করতে পারা, যেমন- “তোমার জুতা মেঝের উপর রাখো”
  • যেখানকার জিনিস সেখানে রাখার বিষয়টি বুঝতে ও রাখতে পারা।
  • ‘পায়খানা’ বা ‘প্রস্রাব’ কে বোঝানোর মত শব্দগুলো রপ্ত করা।

সাধারণত মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের আগে পটিতে অভ্যস্ত হয়। তবে উভয়ের ক্ষেত্রেই নিমোক্ত বিষয়গুলো কিছুটা সময় বেশি নিয়ে নিতে পারে। যেমন-

  • নতুন ভাই বা বোন (সিবলিং) আসন্ন বা এসে থাকলে।
  • প্রি-স্কুলে / ডে-কেয়ারে থেকে থাকলে।

মনে রাখতে হবে- এটা একটু বিলম্বই কেবল। এবং এর থেকে শিশু বের হয়ে আসবে। সময় দিতে হবে। কারণ; প্রতিটা শিশুই আলাদা এক একটি সত্ত্বা।

শিশুকে টয়লেট ট্রেনিং দেয়ার কিছু টিপস

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর ১৮ থেকে ২০ মাসের মধ্যে ট্রেনিং শুরু করলে খুব দ্রুত ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। কারণ এই বয়সে শিশু শারীরিক, আচরণগত ও বুদ্ধিভিত্তিক সংকেতগুলো বোঝার উপযোগী হয়ে ওঠে ও সহযোগিতা করার জন্য সম্পূর্ণ তৈরি থাকে। তবে এ কথাও ঠিক, মা যদি তাড়াতাড়ি পটি ট্রেনিং শুরু করতে চান সে ক্ষেত্রে সন্তানের সঙ্গে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। তাতে শিশুর নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস জন্মায়।

বাচ্চাদের পটি ট্রেনিং দেয়ার ক্ষেত্রে কার্যকরী উপায় হল তাদের ডায়াপার, ট্রেনিং প্যান্ট বা ন্যাপি থেকে দূরে রাখা। এমনটাই কিন্তু বলেন আমাদের শিশু বিশেষজ্ঞরা। আমাদের মা-খালারাও কিন্তু এর কড়া সাপোর্টার। শুধু মাত্র ঘুমের সময় সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে । তবে, বাবু জেগে থাকা অবস্থায় নিজেকে কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলে সে ক্ষেত্রে ঘুমের সময়ও ডায়াপার বা ন্যাপি প্রয়োজনটা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। নিচে কিছু পরামর্শ বা টিপস দেয়া হলো যেগুলো আপনি অনুসরণ করতে পারেন-

সঠিক জিনিসটি বাছাই করুন

সঠিক পটি ট্রেনিংয়ের জন্য উপযুক্ত পটি দরকার। পটি হতে হবে আরামদায়ক ও দেখতে আকর্ষণীয়, যাতে দেখেই শিশুর কাছে যেতে ইচ্ছা করবে এবং বসার পর আরাম পেলে পরেরবার তাকে জোর করতে হবে না। প্রাথমিকভাবে পটিটি নিচু হলে শিশুর পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।

বাজারে এখন নানা রকম বাহারী পটি পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বাবুর জন্য পটি কেনার ক্ষেত্রে দেখে নিতে হবে –

  • পটির যেখানে ময়লাটা জমা হবে তার ধারন ক্ষমতা যেন বেশি হয়। এতে করে মলমূত্র ত্যাগের পর তা বাবুর নিম্নাংগে লেগে অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরী হবে না।
  • বাবুর জন্য যেন তা আরামদায়ক হয়। অর্থাৎ চেপে বসতে না হয়।
  • উচ্চতা যেন এমন হয় যাতে সে নিজেই আরাম করে বসতে পারে।
  • পা যেন মাটিকে স্পর্শ করে।

রুটিন তৈরি করুন

ট্রেনিংয়ের শুরুতে মা-বাবার উচিত কমপক্ষে এক সপ্তাহের জন্য এ কাজের ওপর নিয়মিত একটি চার্ট তৈরি করা। তাহলে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁরা বুঝতে পারবেন। যেমন : শিশুরা দিন-রাত মিলিয়ে কতবার এবং কখন কখন সাধারণত পটি করে, তা পর্যবেক্ষণ করে প্রথমে চার্টে লিখে সাজাতে হবে। শিশুরা সারা দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার প্রস্রাব করে, আর দুবার পায়খানা করে। তবে খাদ্যাভ্যাসের কারণে ব্যতিক্রম হতেই পারে। তারপর সে অনুযায়ী শিশুকে পটি ট্রেনিং দেওয়া শুরু করতে হবে এবং দিনে কতবার সফল হলো তা চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে লিখে রাখলে সপ্তাহ শেষে বোঝা যাবে ট্রেনিংয়ে কতটুুকু সফলতা এসেছে। এভাবে প্রতি সপ্তাহে একটু করে সফলতার দিকে এগোতে হবে।

পটির অভ্যাস গড়ে তুলতে ওকে নির্দিষ্ট বিরতিতে পটিতে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে ওকে জিজ্ঞেস করা যাবেনা যে সে পটিতে বসবে কিনা। কারণ ‘না’ বলাটা ওদের সহজাত স্মার্টনেস।বিরতী বা নিয়ম যাই বলুন না কেন, এর মাঝে থেকেও বাবু এক্সিডেন্ট করবেনা তা নয়। এক্ষেত্রে বাবুর একসিডেন্ট বা যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচার কে ‘ঠিক আছে, কোন সমস্যা নেই বলে এনকারেজ করা যাবেনা’। আবার বকুনি দিয়ে দমিয়ে দেয়া যাবেনা। বরং আপনি একটু মন খারাপ করে বলুন- “এর পরের বার পটিতে, ঠিক আছে?”

দেখে শেখা

শিশুরা সাধারণত দেখে শেখে বা অনুকরণ করতে পছন্দ করে। তাই সম্ভব হলে মা নিজে দেখাতে পারেন বা শিশুর পছন্দের কোনো পুতুল দিয়েও ডেমো দেখাতে পারেন। আজকাল পটি ট্রেনিংয়ের ওপর কিছু এনিমেশন কার্টুন আছে সেগুলো শিশুকে দেখালে তাদের জন্য বোঝা অনেক সহজ হবে। তার বড় ভাই বা বোন থাকলে এবং তারা যদি পটি ব্যাবহার করতে শেখে তবে সে তাদের দেখে দেখে পুরো ব্যাপারটা শিখতে পারবে।

পটি ট্রেনিং ঠিকঠাক ভাবে করাতে হলে গোটা ব্যাপারটার সময় শিশুর সঙ্গে কথা বলে যাওয়াটা জরুরী। এই সময় কিছু শব্দ বারবার ব্যবহার করার চেষ্টা করুন যাতে আপনার বাচ্চা পটির সঙ্গে সেই শব্দগুলোকে জুড়তে পারে। প্রথম কয়েক মাস ট্রেনিংয়ের পর যখন শিশুর মুখে কথা ফুটবে তখন সে নিজেই সেই শব্দগুলো নিজের পটির প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করতে চাইবে; হয়ত স্পষ্ট ভাবে বলতে পারবে না কিন্তু আধো আধো উচ্চারণে সেই শব্দগুলোকে বোঝাতে চেষ্টা করবেই। সে জন্যেই পটি ট্রেনিংয়ের সময় কয়েকটা শব্দকে বার বার ব্যবহার করুন যা’তে শিশুর মুখে বুলি ফুটলে সে নিজে সেই শব্দ ব্যবহার করে নিজের পটিতে যাওয়ার দরকারটা সহজে জানান দিতে পাড়বে। দেখবেন , একটু বড় হলে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনের কথা সে নিজে থেকেই আপনাকে বলতে পারছে

উৎসাহ দিন

যখনই শিশু সঠিক নিয়মে পটি করবে, তাকে প্রশংসা করতে হবে ও উৎসাহ দিতে হবে। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো উপহারও দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশুর আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। বাবুর পটির ব্যবহার কে উৎসাহ দেবার জন্য ওর প্রত্যেকটি সফল প্রয়াশে বিজয় উদ্‌যাপন করতে পারাটা জরুরী। তবে, এটাকে এমন পর্যায়েও নিয়ে যাওয়া যাবে না যাতে সে বেশি পরিমাণ সেলফ কনশাস হয়ে পরে।

পটি নাগালের মধ্যে রাখুন

পটি এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে বাবু সহজেই তার একসেস পায়। প্রয়োজনে যে রুমগুলোতে ও বেশি সময় বিচরন করে; সে রুমগুলোতে একটি করে রাখুন।

ধৈর্য ধরুন

ট্রেনিং শুরুতেই শিশুর কাছে নির্ভুল শিক্ষা আশা করা একদম ঠিক হবে না। মা-বাবকে যথেষ্ট ধৈর্য ধারণ করতে হবে। বিফলতায় হতাশ হওয়া যাবে না কোনোভাবেই। কিছু না কিছু সমস্যা হবেই। যদি আপনার বাচ্চা দিনে অনেকবার জামাকাপড় নোংরা করে ফেলে তবে তাকে হয়তো এখন ট্রেনিং দেয়ার সময় হয়নি। পুনরায় বাচ্চা ন্যাপী পড়ানো শুরু করায় কোনও লজ্জা নেই।

মনে রাখবেন; কাজটা সহজ নয়, মাঝে মধ্যে খুব কঠিন ঠেকতেই পারে কিন্তু হাল ছাড়বেন না। মন দিয়ে লেগে থাকাটা জরুরী। এবং মনে রাখবেন শিশুরা সবসময় অঙ্ক মেনে চলবে না; মাঝে মধ্যে দু’একটা দুর্ঘটনা হতেই পারে।এই বয়সের শিশুরা নিজেদের বাড়ির পরিবেশেই অভ্যস্ত থাকে, বাইরে গেলে তারা সামান্য ঘাবড়ে যাবেই এবং সদ্য শেখা নিয়ম কানুন গুলিয়ে যেতেই পারে। কাজেই ছোটখাটো গণ্ডগোলগুলো মানিয়ে চলতে হবে। অতএব বাড়ির বাইরে গেলে বাচ্চাদের ডাইপার পরিয়ে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পরিশিষ্ট

সন্তান মানুষ করা চাট্টিখানি কথা নয়। তাই ধৈর্য সহকারে এর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই অভ্যাস গঠনের ফলে শিশুর জীবনে শৃঙ্খলা আসবে, অপরিচ্ছন্নতা দূর করবে এবং শিশু দুর্গন্ধমুক্ত থাকবে। শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য টয়লেট ট্রেনিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। বাচ্চারা একবার পটি ট্রেনড হয়ে গেলে আপনার অনেকটা চাপও কমে যাবে; কাপড়জামা কাচা ধোয়া শুকোনোর ধকল অনেকটা কমবে, ডাইপারের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যাবে, বিছানার চাদর আর অপরিষ্কার থাকবে না এবং সবচেয়ে বড় কথা ন্যাপি-র‍্যাশ থেকে মুক্তি।

তথ্যসূত্রঃ supermombd, babycenter

Source: fairy land

Load More Related Articles
Load More In সোনামনির যত্ন
Comments are closed.

Check Also

এক বছরের ছোট বাচ্চাদের কেন বাহিরের দুধ খাওয়াবেন না?

গরুর দুধের কৌটা বা প্যাকেটের নিচের কোনায় ছোট্ করে লেখা থাকে “এক বছরের নিচের শিশুর জন্য প্…