Home মায়ের যত্ন ঋতুস্রাবের কারণ ও বিচিত্র ইতিহাস

ঋতুস্রাবের কারণ ও বিচিত্র ইতিহাস

33 second read
0
234

মেয়েটির বয়স যখন কেবল এগারো তখনই হয়তো তার পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব (menstruation) এর অভিজ্ঞতা হয়। তারপরের কয়েক বছর তা শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণই হয়ে দাঁড়ায় না, সাথে তাকে সহ্য করতে হয় অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা। এসময়টা হট ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে তাকে কুঁকড়ে থাকতে হয় বিছানায়, সামান্য নড়াচড়া করাটাও যেন হয়ে ওঠে বিশাল যন্ত্রণা। অধিকাংশ মেয়েদেরকেই এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো একদমই অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে অন্যান্য প্রাণীদের এই পিরিয়ডের ঝামেলা নেই। তাই এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা রহস্যজনকও বটে। ঋতুস্রাব কেন হয়? কেন শুধু মানুষের মাঝেই এটি দেখা যায়? এটি দরকারি হয়ে থাকলে অন্যান্য প্রাণীদের বেলায় কেন নেই?

ঋতুচক্র প্রজননের একটি অংশ। নারীর প্রজনন প্রক্রিয়া প্রতি মাসে দুটি হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের প্রতি সাড়া দেয়। প্রতিমাসে জরায়ুর সবচেয়ে ভেতরের স্তর, এন্ডোমেট্রিয়াম গর্ভধারণের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে ঋতুস্রাবের সাহায্যে।

এন্ডোমেট্রিয়াম কতগুলো স্তরে সজ্জিত এবং রক্তনালিকা সমৃদ্ধ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ না করলে প্রোজেস্টেরন লেভেল কমতে থাকে। এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু এবং রক্তনালিকাগুলো তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং যোনিপথে বেরিয়ে যায়। এই রক্তপাতকেই বলে ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড। সাধারণত প্রতি ২৮ দিন পর পর এই চক্র সম্পন্ন হয়ে থাকে।  এই চক্রকে বলে ঋতুচক্র।

একজন নারীর ঋতুস্রাবের সময় গড়পড়তা ৩  থেকে ৭ দিন। এই সময়ে মোটামুটি ৩০ থেকে ৯০ মিলিলিটার  ফ্লুইড দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। এই ফ্লুইডে থাকে রক্ত, মিউকাস ও এন্ডোমেট্রিয়ামের ভাঙা অংশ। এই পরিমাণটা জানা খুব সহজ, ব্যবহার করার আগের ও পরের স্যানিটারী ন্যাপকিনের ভরের পার্থক্য থেকেই বের করা যায়।

অনেকেই এই প্রক্রিয়াটিকে অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয় বলে মনে করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এর প্রয়োজনীয়তা কী? কেন এটা হয়? আগে মনে করা হতো ঋতুস্রাব হয়ে থাকে নারীদেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেবার জন্য। ১৯০০ সালের দিকের বেশিরভাগ গবেষণা মেয়েদের ঋতুস্রাবকে ট্যাবু হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধারণা এখনো রয়ে গেছে।

১৯২০ সালে Bela Schick নামের একজন বিখ্যাত শারীরতত্ত্ববিদ ‘Menotoxin’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একটি গবেষণা করেছিলেন যেখানে দুইজন মহিলা হাতে কিছু ফুল নিয়ে ধরে থাকেন। একজনের পিরিয়ড চলছিল এবং আরেকজন স্বাভাবিক ছিলেন। schick প্রস্তাব করেন, পিরিয়ড চলাকালীন মহিলার চামড়া থেকে বিষাক্ত পদার্থ (menotoxin) নিঃসৃত হয় যার কারণে ফুল নেতিয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, পিরিয়ডকালীন এই বিষাক্ত পদার্থ ইস্টের বংশবৃদ্ধিও রহিত করে দেয়। তার ধারণা ছিল এই বিষাক্ত পদার্থটি পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে নারীর ঘামের সাথে নিঃসৃত হয়ে থাকতে পারে। কয়েকজন বিজ্ঞানী আবার তাকে সমর্থনও জানালেন। তারা বললেন, পিরিয়ড চলাকালীন একজন মহিলা তার গা থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে গাছের বৃদ্ধি রহিত করে ফেলতে পারে, এমনকি বিয়ার, ওয়াইন, পিকেলসও নষ্ট করে ফেলতে পারে।
না, ঋতুস্রাব চলাকালীন নারী ফুলের নেতিয়ে পড়ার কারণ নয়

ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা

গবেষক Clancy আবার মত প্রকাশ করেন, এসব গবেষণা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এগুলো করা হয়েছিল সেই সময়ে যখন সমাজে মেয়েদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত নিচের দিকে। বলা যায় অনেকটা পরিকল্পতভাবেই এমন ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা করা হয়েছিল। এসব গবেষণার সাহায্যে এটি কখনোই প্রমাণ হয় না যে, আসলেই মেনোটক্সিন নামক কোনো বিষাক্ত কিছু পিরিয়ডের সময় নিঃসৃত হয়।

১৯২৩ সালে ঋতুস্রাব নিয়ে আরেকটি অনুমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার Margie Profet প্রস্তাব করেন, নারীদেহে শুক্রাণুর সাথে যে রোগজীবাণু প্রবেশ করে তাদের থেকে রক্ষার জন্যই ঋতুস্রাব হয়ে থাকে। Clancy আবার এসময় বলেন যে, “আসলে পুরুষেরাই হলো অপরিচ্ছন্ন, পুরুষের এই অপরিচ্ছন্নতার জন্য প্রবেশকৃত রোগ জীবাণু দূর করার জন্যই মেয়েদের ঋতুস্রাব হয়।”
শুক্রাণুই কি নারীর ঋতুস্রাবের কারণ?
উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে profet এর ধারণার খুব তাড়াতাড়িই মুখ থুবড়ে পড়ে। কেননা তার ধারণা সঠিক হলে ঋতুস্রাবের আগে জরায়ুতে অনেক রোগজীবাণু থাকার কথা ছিল, কিন্তু এমনটা হয় না। এমনকি কিছু কিছু গবেষণা এটাও বলে যে ঋতুস্রাব ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। সেখানে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ভালো বংশবিস্তার করতে পারে। এখানে আয়রন, প্রোটিন, সুগার সবই থাকে। আবার ঋতুস্রাবের সময় যোনিপথের আশেপাশে মিউকাসের পরিমাণ কম থাকে, ফলে ব্যাকটেরিয়ার জন্য বেঁচে থাকা খুবই সুবিধাজনক হয়।

শক্তির ব্যবহার

Profet এর সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মিশিগান ইউনিভার্সিটির Beverly Strassmann. ১৯৯৬ সালে তিনি নিজের ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন ঋতুস্রাব বোঝার জন্য শুধু মানুষের উপর গবেষণা করলেই চলবে না,অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের বংশবিস্তার সমন্ধেও গবেষণা দরকার। তাদের প্রক্রিয়াও আলোচনায় আনা জরুরী। তার মতে, জরায়ুর মধ্যকার একটি পুরু রক্তনালিকা সমৃদ্ধ স্তরকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রেও জরায়ুর ভেতরের স্তরটি থাকে। গর্ভধারণ না করলে স্তরটির ভেতরের পদার্থগুলো শোষিত হয়ে যায় অথবা ভেঙে বেরিয়ে যায়। স্ট্রেসম্যানের মতে,স্তরটি ভেঙে আবার তৈরি করতে কম শক্তির প্রয়োজন হয়।

তিনি আসলে এখানে শক্তির মিতব্যয়ীতা বোঝাতে চেয়েছেন,রক্তপাতের কারণ ব্যাখ্যা করতে চাননি। অবশ্য নারীদেহ সম্পূর্ণ রক্ত শোষণ করতে পারবে কিনা এটাও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। অনেক বেশি পরিমাণ রক্ত হলে ঋতুস্রাবই ভালো পন্থা। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে এ ধরনের রক্তপাত অভিযোজন নয় বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

মায়ের সাথে গভীরভাবে প্রোথিত

লিভারপুল ইউনিভার্সিটির Colin Finn এমনই আরেকটি ধারণা দেন ১৯৯৮ সালে। তার মতে শক্তি সংরক্ষণের জন্য নয় বরং ডিম্বাণুর বেড়ে ওঠার জন্য ঋতুস্রাব প্রয়োজনীয়। ফিনের মতে ভ্রুণ বিভিন্ন স্তরের সাহায্যে মায়ের শরীরের সাথে খুব গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। যার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পর কিছু সময়ের জন্য জরায়ু গর্ভধারণের জন্য যথাযথভাবে তৈরি থাকে। সময়মতো গর্ভধারণ না করলে উপরের স্তর আবার ভেঙে যায়।

উপরের দুটি ধারণাই সঠিক হতে পারে। সত্য অনুসন্ধানের জন্য আমাদের তুলনা করতে হবে অন্যান্য প্রজাতির সাথে যাদের ঋতুস্রাব হয় আর যাদের হয় না। মানুষ ছাড়া আর যেসব প্রাণীর ঋতুস্রাব হয় তাদের অধিকাংশই প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত। বানর, এপ, মানুষ সবাই আছে এর মাঝে।

ঋতুস্রাব হয় এমন একটি প্রজাতি হলো rhesus macaques. বড় আকারের এপের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যায়। এছাড়া শিম্পাঞ্জি আর গিবনের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই দেখা যায়। গরিলা আর ওরাং-ওটাং এর মধ্যে অবশ্য বহুলভাবে দেখা যায় না। অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে টারশিয়ারের ঋতুস্রাব দেখা যায়, তবে খুব বিরল।
চিত্রঃ rhesus macaques, এদের মানুষের মতো ঋতুস্রাব হয়
পরিচিত প্রাণীদের মধ্যে হাতি আর বাদুরের ঋতুস্রাবীয় রক্তপাত হয়ে থাকে। নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির John Rasweiler এর মতে বাদুরের দুইটি গোত্র, free tailed bats এবং leaf-nosed bats এর পিরিয়ড হয়ে থাকে।

ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণী খুবই অল্প

উপরে উল্লেখিত প্রজাতিদের ঋতুস্রাব মোটামুটি মানুষের মতোই। শর্ট টেইলড ফ্রুট বাদুরের রজঃচক্র ২১–২৭ দিনের যেমনটা হয় মানুষের। বাদুরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানুষের মতো তেমন স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও এটি বোঝা যায় কারণ এই বাদুরগুলোর জরায়ুকে ঘিরে ছোট ছোট রক্তনালিকা থাকে। দেখা যাচ্ছে ঋতুস্রাব হয় এমন প্রজাতি হাতে গোনা যায়। মানুষ, এপ, বানর, বাদুর এবং হাতী।

ভ্রুণ হতে আসা সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে জরায়ুর পরিবর্তন

ইয়েল ইউনিভার্সিটির Deena Emera’র মতে, একজন মায়ের তার জরায়ুর উপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে সেটি তার নিজের উপরই নির্ভর করে। ২০১১ তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ইমেরা এবং তার সহকর্মীগণ উল্লেখ করেন, ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণীদের জরায়ুর ভেতরের স্তরটি সম্পূর্ণরূপে মায়ের দেহের প্রোজেস্টেরন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভ্রুণ শুধুমাত্র তখনই জরায়ুতে স্থাপিত হয় যখন জরায়ুর ভেতরের দেয়াল পুরু আর বড় বিশেষায়িত কোষযুক্ত হয়। একজন মহিলা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি গর্ভবতী হবেন কিনা। এই ক্ষমতাকে বলে ‘spontaneous decidualisation.

অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে ভ্রুণ হতে আসা সংকেত জরায়ুর পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গর্ভাবস্থার প্রতি সাড়া দিতেই জরায়ুর পরিবর্তন হয়ে থাকে। ইমেরার মতে, “যেসব প্রজাতির ঋতুস্রাব হয় এবং যারা spontaneous decidualisation ক্ষমতা প্রদর্শন করে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে।”

এর উপর ভর করেই তিনি মূল জিজ্ঞাসা খুঁজে বের করেন- “কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে কেন গর্ভাবস্থা মা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে আর কিছু প্রজাতির তা নিয়ন্ত্রিত হয় ভ্রুণ দ্বারা?” তিনি মত প্রকাশ করেন spontaneous decidualisation ক্ষমতাটা তৈরি হয়েছে মা এবং ভ্রুণের মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য।

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে এবার দুটি সম্ভাবনা দেখানো যায়। প্রথমটি হলোঃ spontaneous decidualisation (গর্ভাবস্থা নিয়ন্ত্রণে মায়ের ক্ষমতা), যা আক্রমণাত্মক ফিটাস হতে মাকে রক্ষা করার জন্য বিকশিত হয়েছে।

সকল ভ্রুণই মায়ের জরায়ুতে গভীর পরিচর্যার জন্য আশ্রয় নেয়। ঘোড়া,গরু,শূকর এদের ক্ষেত্রে ভ্রুণ আলতোভাবে জরায়ুর উপরে স্থান নেয়। বিড়াল,কুকুরের ক্ষেত্রে ভ্রুণটি আরেকটু গভীরে প্রবেশ করে। কিন্তু মানুষ সহ অন্যান্য প্রাইমেটদের ভ্রুণ অত্যন্ত গভীরভাবে জরায়ু প্রাচীরে প্রোথিত হয়। কেউ কেউ এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, মা আর শিশু যেন একটি “চিরায়ত রশি টানাটানি” যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।
মা চায় তার প্রত্যেক সন্তানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি বরাদ্দ রাখতে যাতে করে তার শক্তি কিছুটা বাঁচে এবং তা অন্য সন্তানকে দিতে পারে। অপরদিকে বেড়ে উঠতে থাকা বাচ্চাটি চায় তার মা থেকে যতটা সম্ভব বেশি শক্তি ব্যবহার করতে। ইমেরার মতে, “বাচ্চাটি যত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মা ততই সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে থাকে বাচ্চার আক্রমণ ঠেকানোর জন্য।”

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, spontaneous decidualisation ব্যবস্থাটি উন্নতি লাভ করেছে অনাকাঙ্খিত ভ্রুণ প্রতিরোধ করার জন্য। জীনগত অস্বাভাবিকতা ভ্রুণের ক্ষেত্রে খুব বেশি দেখা যায়। যার কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই অনেকের গর্ভপাত হয়। এটা হতে পারে অস্বাভাবিক যৌন ক্রিয়াকলাপের কারণে।

ভ্রুণে পরিণত হওয়া ডিম্বাণুটির বয়স বেশিও হতে পারে

মানুষ যেকোনো সময় যৌন সঙ্গমে মিলিত হতে পারে যেখানে অন্যান্য প্রাণীরা শুধুমাত্র ডিম্বপাতের সময় অর্থাৎ প্রজননকালে যৌন সঙ্গম করে। এটিকে বলে সম্প্রসারিত যৌন কাল।

অন্যান্য কিছু ঋতুস্রাবীয় প্রাইমেটদের ক্ষেত্রেও এই সম্প্রসারিত যৌনকাল দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে অনেক সময় নিষিক্ত ডিম্বাণুর বয়স বেশ বেশি থাকে, যার কারণে এতে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। জরায়ু পুরু হয়ে পরিবর্তিত হয়ে গেলে এটি স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক ভ্রুণের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারে। spontaneous decidualisation মাকে বাঁচানোর একটি পদ্ধতি হতে পারে। এটি মাকে অস্বাভাবিক ভ্রুণ হতে রক্ষা করে এবং নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করে।

এ থেকে একটি বিষয়ে ধারণা লাভ করা যায়, অধিকাংশ ঋতুস্রাবীয় স্তন্যপায়ীদের গর্ভকাল একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী হয়ে থাকে এবং তারা সন্তান ভূমিষ্ঠ করতে অধিক শক্তি বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি হয়। ঝামেলাজনক গর্ভাবস্থা এড়ানোর জন্যই তারা বিবর্তিত হয়েছে।

সুতরাং ঋতুস্রাব বিবর্তনের একটি পার্শ্বক্রিয়া

২০০৮ সালে রেসাস বানরের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এদের ভ্রুণের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে এরকম তথ্য না পাওয়ার কারণে এই গবেষণা বেশি দূর এগোয়নি। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা spontaneous decidualisation এর কারণ খুঁজে বের করতে পারছি,ততক্ষণ ঋতুস্রাবের ধাঁধার জট খুলতে পারবো না।

স্ট্রেসম্যান,ফিন,ইমিরা সহ সকলের গবেষণা একটি দিক নির্দেশ করছে যে,ঋতুস্রাব প্রজননজনিত কারণে বিবর্তনের একটি আকস্মিক ঘটনা। যেসব প্রজাতি অন্যভাবে প্রজনন ঘটিয়ে থাকে তাদের ঋতুস্রাবের প্রয়োজন হয় না। বন্যপ্রাণীদের মধ্যে ঋতুস্রাব খুব বিরল হয়ে থাকে।

মানুষের ক্ষেত্রে,যেসকল সমাজে গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা কম,তাদের ঋতুস্রাবও কম হয়। এমনকি সেসব স্থানে মানুষ এখনো প্রাকৃতিক জন্মদানের উপর নির্ভরশীল। সেখানকার মহিলারা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটায় সন্তান জন্ম দিয়ে অথবা সন্তানকে স্তন্যদান করে।

মালির ডগন সম্প্রদায়ে গবেষণা করে স্ট্রেসম্যান আবিষ্কার করেছেন সেখানের মহিলারা জীবনে ১০০ টি পিরিয়ড পেয়ে থাকেন যেটা আমাদের প্রজাতির ক্ষেত্রে মোটামুটি স্বাভাবিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো স্বাভাবিক বিশ্বের মহিলারা ৩০০–৫০০ টি পিরিয়ড পান।
চিত্রঃ ডগন নারীরা নারীত্বের বেশিরভাগ সময়েই গর্ভবতী কিংবা দুগ্ধদানরত অবস্থায় থাকেন
Clancy বলেন, “এমন অনেক মহিলা আছেন যারা পিরিয়ড না হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু আসলে আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বিশাল। সুতরাং প্রতিটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে বরং একটু সময় নেওয়াই ভাল।”

যাহোক এত বিশাল আলোচনা হয়তো একটি ১১ বছর বয়সী মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাবের যন্ত্রণাকে কমাতে পারবে না। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে ঠেলে দিয়ে আমাদের সকলের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীই পারে এই কষ্টকে ঘুচাতে। হাজার হোক একজন মানুষ, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তার জন্ম তো হয় এই ঋতুস্রাব প্রক্রিয়ার কারণেই।

Source: z2i.org

Load More Related Articles
Load More In মায়ের যত্ন
Comments are closed.

Check Also

আপনি কি বাচ্চার জন্যে কাপড়ের ন্যাপি ব্যবহার করেন? সেটির ভালো ও খারাপ উভয় দিক সম্পর্কে জানতে চান?

আপনি কি সেইসব মায়েদের মধ্যে পড়েন যাঁরা কেনা ডাইপার ব্যবহার করতে দ্বিধা বোধ করেন? এখন এ ব্য…